সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

মেজর জিয়াউর রহমান ও ১১ সেক্টরভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠিত রূপরেখা

মেজর জিয়াউর রহমান ও ১১ সেক্টরভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠিত রূপরেখা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে সারাদেশে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) গঠিত হয়, যা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেয়।

এই সরকারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমএ রব দায়িত্ব পালন করেন চিফ অব স্টাফ (সেনা প্রধানের সহযোগী প্রধান সামরিক কর্মকর্তা) হিসেবে।

গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে যুদ্ধ ছিল বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত। তাই একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। এর ফলে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। ১০-১৭ জুলাই কলকাতায় সেক্টর কমান্ডারদের সম্মেলনে এই কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়।


১১টি সেক্টর ও কমান্ডার

১ নং সেক্টর:

  • এলাকা: চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার
  • কমান্ডার: মেজর জিয়াউর রহমান (প্রাথমিক), পরে মেজর রফিকুল ইসলাম
  • বিশেষত্ব: কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা

২ নং সেক্টর:

  • এলাকা: ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফরিদপুরের অংশ
  • কমান্ডার: মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর এটিএম হায়দার
  • সদর দপ্তর: ত্রিপুরা সীমান্ত অঞ্চল

৩ নং সেক্টর:

  • এলাকা: হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেটের অংশ
  • কমান্ডার: মেজর কে এম শফিউল্লাহ, পরে মেজর এ এন এম নুরুজ্জামান
  • সদর দপ্তর: তেলিয়াপাড়া (মেঘালয়)

৪ নং সেক্টর:

  • এলাকা: সিলেটের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল
  • কমান্ডার: মেজর সি আর দত্ত

৫ নং সেক্টর:

  • এলাকা: সিলেট সীমান্তবর্তী এলাকা
  • কমান্ডার: মেজর মীর শওকত আলী

৬ নং সেক্টর:

  • এলাকা: রংপুর, দিনাজপুর
  • কমান্ডার: উইং কমান্ডার এম কে বাশার

৭ নং সেক্টর:

  • এলাকা: রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা
  • কমান্ডার: মেজর নাজমুল হক, পরে মেজর কাজী নুরুজ্জামান

৮ নং সেক্টর:

  • এলাকা: কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর
  • কমান্ডার: মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, পরে মেজর এম এ মঞ্জুর

৯ নং সেক্টর:

  • এলাকা: বরিশাল, খুলনা, সুন্দরবন অঞ্চল
  • কমান্ডার: মেজর এম এ জলিল

১০ নং সেক্টর (নৌ সেক্টর):

  • এলাকা: উপকূলীয় ও নৌপথ অঞ্চল
  • নিয়ন্ত্রণ: সরাসরি জেনারেল এম এ জি ওসমানী
  • বিশেষত্ব: নৌ-কমান্ডো অপারেশন (অপারেশন জ্যাকপট)

১১ নং সেক্টর:

  • এলাকা: ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল
  • কমান্ডার: মেজর আবু তাহের (প্রাথমিক পর্যায়ে), পরবর্তীতে পুনর্গঠন ও পরিবর্তন ঘটে
  • পরবর্তী পর্যায়: যুদ্ধ পরিস্থিতি অনুযায়ী নেতৃত্বে পরিবর্তন হয় এবং শেষদিকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হামিদুল্লাহ খানসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন
  • বিশেষত্ব: গেরিলা যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র

ব্রিগেড ফোর্স গঠন (বিশেষ ইউনিট)

Z Force

  • কমান্ডার: মেজর জিয়াউর রহমান
  • গঠন: জুলাই ১৯৭১
  • ইউনিট: ১ম, ৩য়, ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট

K Force

  • কমান্ডার: মেজর খালেদ মোশাররফ
  • গঠন: অক্টোবর ১৯৭১
  • ইউনিট: ৪র্থ, ৯ম, ১০ম ইস্ট বেঙ্গল

S Force

  • কমান্ডার: মেজর কে এম শফিউল্লাহ
  • গঠন: অক্টোবর ১৯৭১
  • ইউনিট: ২য় ও ১১তম ইস্ট বেঙ্গল

১১টি সেক্টরে বিভক্ত এই সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো মুক্তিযুদ্ধকে নতুন গতি ও সমন্বয় প্রদান করে। এর ফলে গেরিলা যুদ্ধ আরও কার্যকর হয় এবং চূড়ান্ত বিজয় ত্বরান্বিত হয়।

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।

সেক্টর ব্যবস্থা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশলগুলোর একটি, যা অসংগঠিত প্রতিরোধকে একটি সংগঠিত জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *