সর্বশেষ :
20 Oct 2026, Tue

বিএনপি ক্ষমতায় না গেলে ভাত খাবেন না- এমন প্রতিজ্ঞা করা ইনু মিয়াকে ১৭ বছর পর ভাত খাওয়ালেন প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এমপি

বিএনপি ক্ষমতায় না গেলে ভাত খাবেন না- এমন প্রতিজ্ঞা করা ইনু মিয়াকে ১৭ বছর পর ভাত খাওয়ালেন প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এমপি

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): প্রিয় দলকে ভালোবেসে অনেক নেতা-কর্মী ও সমর্থক নানা কিছু করেন। বেশিরভাগই রাজনৈতিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে চান। তবে ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ কৃষক ইনু মিয়ার গল্প অন্যদের থেকে আলাদা। তার পছন্দের রাজনৈতিক দল বিএনপি। প্রিয় দলটির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে না পেরে তিনি প্রতিবাদস্বরূপ ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাত খাননি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাত খাওয়া শুরু করেন তিনি।

পহেলা বৈশাখ, ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার, দুপুর আড়াইটার দিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের সংসদ সদস্য, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম এমপি ১৭ বছর ধরে ভাত না খাওয়া ইনু মিয়ার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার রামদী ইউনিয়নের পশ্চিম জগৎচর গ্রামে গিয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ হাতে ভাত খাওয়ান।

নিজ দলের প্রিয় নেতার হাতে প্লেটে ভাত তুলে দেওয়ার পর হাসিমুখে ভাত খাওয়া শুরু করেন ইনু মিয়া। এর আগে তিনি ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে শুধু কলা, রুটি, বিস্কুটসহ শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটিয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১২ জানুয়ারি সোমবার উপজেলার রামদী ইউনিয়নের জগৎচর পশ্চিমপাড়ায় স্থানীয় বিএনপির এক কর্মীসভায় নেতাকর্মীরা ভাত-তরকারি এনে ইনু মিয়াকে খেতে অনুরোধ করেন। তবে তা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলেই তিনি ভাত খাবেন। সেদিন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী, বর্তমান প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি তাকে কথা দেন, বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে আমি নিজ হাতে আপনাকে ভাত খাওয়াব। নিজের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই নির্বাচনের পর ১৪ এপ্রিল তিনি ইনু মিয়ার প্লেটে ভাত তুলে দেন।

ইনু মিয়াকে ভাত খাওয়ানোর পর প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি বলেন, যে ব্যক্তি দলকে ভালোবেসে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, আমাদের উচিত তার পাশে থাকা। ভাত না খেয়ে বয়োবৃদ্ধ ইনু মিয়া প্রতীকী প্রতিবাদ করে গেছেন। আমরা দলীয় নেতাকর্মীরা তার যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকব, ইনশাআল্লাহ।

তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, অচিরেই ইনু মিয়াকে একটি নতুন ঘর তৈরি করে দেওয়া হবে এবং একটি বয়স্ক ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের হুঁশিয়ার করে বলেন, দলের কেউ কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে তিনি থানা পুলিশের উদ্দেশ্যে বলেন, ভৈরব-কুলিয়ারচর থেকে মাদক নির্মূল করতে না পারলে আপনারা অন্যত্র বদলি হয়ে যান। আমার দলের কেউ যদি মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যায়কারীদের সঙ্গে আমি থাকব না। আগে কী হয়েছে তা জানতে চাই না, কিন্তু এখন থেকে ভৈরব-কুলিয়ারচরকে মাদকমুক্ত করতেই হবে।

এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান, উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. কিতাব আলী, সাধারণ সম্পাদক এম. এ. হান্নান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. শাহ আলম, কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিনসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন নেতা-কর্মী।

ইনু মিয়াকে ভাত খাওয়ানোর আগে তিনি প্রতিমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেন। প্রতিমন্ত্রীও তাকে ফুলের মালা পরিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

জানা যায়, জগৎচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত সুলায়মান মিয়ার ছেলে ইনু মিয়া কৃষিশ্রমিক হিসেবে মানুষের জমিতে কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাম পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে তিনি লাঠির ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে চলেন। বর্তমানে তিনি আর কাজ করতে পারেন না; শুয়ে-বসে ও ভিক্ষাবৃত্তি করেই দিন কাটে তার।

ইনু মিয়া তিন সন্তানের জনক। স্ত্রী জোছনা খাতুন। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। ছোট ছেলে জাকির হোসেন জুতা তৈরির দোকানে কাজ করেন। মেয়ে মার্জিয়া খাতুনের বিয়ে হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি দলের একনিষ্ঠ সমর্থক। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় পশ্চিম জগৎচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন এবং ভোট দিতে পারেননি। এরপরই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, যতদিন না বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে, ততদিন তিনি ভাত খাবেন না। সেই প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী তিনি ১৭ বছরেরও বেশি সময় ভাত স্পর্শ করেননি। পারিবারিক ও সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেও ভাত খাননি।

দলীয় নেতাদের অনুরোধ, পরিবার ও স্বজনদের চেষ্টাও তাকে ভাত খাওয়াতে পারেনি। তার একটাই কথা ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত তিনি ভাত খাবেন না।

ইনু মিয়া বলেন, পছন্দের দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে গিয়ে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলাম। এরপর প্রতিজ্ঞা করি, বিএনপি ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত মরে গেলেও ভাত খাব না। এখন দল ক্ষমতায় এসেছে, প্রিয় নেতা শরীফুল আলম ভাই নিজ হাতে ভাত তুলে দিয়েছেন, আমি আবার ভাত খাওয়া শুরু করেছি।

তিনি আরও বলেন, আলম ভাই বলেছিলেন, আমাকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাবেন। আমারও সেই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই আমাদের প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। এখন আমার ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।

ইনু মিয়ার স্ত্রী জোছনা খাতুন বলেন, তাকে অনেক চেষ্টা করেছি ভাত খাওয়ানোর জন্য, কিন্তু পারিনি। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছি, তবুও ভাত খাননি। রুটি, পুরি, বিস্কুট আর চা খেয়েই এতদিন বেঁচে ছিলেন। এমনকি মেয়ের বাড়িতেও গিয়ে ভাত খাননি। আজ তিনি ভাত খেয়েছেন, এতে আমার খুব ভালো লাগছে।

রামদী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. আকরাম খান ও সাধারণ সম্পাদক অলি উল্লাহ বলেন, ইনু মিয়া একজন সত্যিকারের বিএনপি-প্রেমী মানুষ। তিনি ২০০৮ সাল থেকে টানা ১৭ বছর ভাত খাননি। অবশেষে আজ আমাদের প্রিয় নেতা শরীফুল আলম ভাইয়ের মাধ্যমে তিনি ভাত খেয়েছেন।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *