সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

দায়সারা তদারকি ও দায়িত্বহীনতায় কালভার্ট নির্মাণে প্রাণ গেল অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের

দায়সারা তদারকি ও দায়িত্বহীনতায় কালভার্ট নির্মাণে প্রাণ গেল অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে এলজিইডি অফিসের দায়সারা তদারকি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতায় নির্মাণাধীন কালভার্টে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের। এ দায় কে নেবে- এমন প্রশ্ন এখন জনমনে।

নিহত সেনা সদস্য মো. আব্দুস সাত্তার (৫৫) কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত আমির উদ্দিনের ছেলে এবং কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স মোছা. নাজমা আক্তারের স্বামী।

তিনি ঢাকার লালবাগ থানার নবাবগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ‘দি শানিন কর্পোরেশন লিমিটেড’ নামক একটি তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) ও ওভেন পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন শাখায় সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

গত ২ জুন মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার ডুমরাকান্দা বাজার থেকে ঢাকা মেট্রো-হ-১৭-৬২১১ নম্বরের একটি মোটরসাইকেলে করে আব্দুস সাত্তার কুলিয়ারচরে তাঁর ভাড়াবাসায় ফিরছিলেন। পথে দ্বাড়িয়াকান্দি-ডুমরাকান্দা সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় নির্মাণাধীন কালভার্টের সামনে এসে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি কালভার্টের বিশাল গর্তে পড়ে যান। এতে তাঁর মাথায় রড ঢুকে গুরুতর আঘাত লাগে।

এ সময় পথচারীরা তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কুলিয়ারচর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

এ মৃত্যুকে ঘিরে এলাকাবাসীর প্রশ্ন- এর দায় কে নেবে? নির্মাণাধীন কালভার্টের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এ দায় এড়াতে পারবে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্বাড়িয়াকান্দি-ডুমরাকান্দা সড়কে পুরোনো কালভার্ট ভেঙে নতুন কালভার্ট নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এলাকাবাসী ও স্থানীয় সাংবাদিকরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) এস. আর. এম. জি. কিবরিয়াকে একাধিকবার বিকল্প (বাইপাস) রাস্তা নির্মাণের অনুরোধ করেছিলেন।

নির্মাণাধীন কালভার্টে একাধিক দুর্ঘটনার ভিডিও ও সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু বিকল্প রাস্তা নির্মাণ না করেই কোনো ধরনের ব্যারিকেড, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা নিরাপত্তা নির্দেশনা ছাড়াই বিশাল গর্ত খুঁড়ে কালভার্ট নির্মাণকাজ চালিয়ে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে নির্মাণকাজও চলছিল ধীরগতিতে।

স্থানীয়দের মতে, উপজেলা এলজিইডি অফিসের তদারকি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীন তদারকির কারণেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর খেসারত দিতে হলো অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুস সাত্তারকে জীবন দিয়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণাধীন কালভার্টটির উভয় পাশে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, ব্যারিকেড ও আলোর ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছিল। বারবার কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও কেউ কর্ণপাত করেনি।

নির্মাণাধীন সড়ক ও কালভার্ট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়াকে এ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তারা সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, ব্যারিকেড এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব ছিল।

সাংবাদিক শাহীন সুলতানা তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি ‘Shahin Sultana’ থেকে ২ জুন রাতে একটি পোস্টে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে লেখেন- “এই মৃত্যুর দায় কার? এই মৃত্যুর দায় শতভাগ কুলিয়ারচর এলজিইডি অফিস এবং ঠিকাদারকে নিতে হবে।

দ্বাড়িয়াকান্দি-ডুমরাকান্দা সড়কে বাইপাস রাস্তা তৈরির জন্য বহুবার অনুরোধ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে ভিডিও করা হয়েছে, প্রকৌশলীকে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু বাইপাস রাস্তা তৈরি না করেই ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। নেই ব্যারিকেড, নেই সাইনবোর্ড, নেই কোনো সতর্কবার্তা।

সাংবাদিকেরা সংবাদ করলেই দোষ। অনেকের কাছে সাংবাদিক নামটাই যেন অ্যালার্জির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আপনাদের গাফিলতির কারণেই আজ একজন মানুষ প্রাণ হারালেন। এর দায় কি আপনারা নেবেন?”

অপরদিকে, একই রাতে সাংবাদিক আলী হায়দার শাহীন তাঁর ‘Our Kuliarchar TV’ ফেসবুক পেজে লাইভে এসে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) এস. আর. এম. জি. কিবরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “কাজটি চট্টগ্রামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। তবে কাজ করছেন ভৈরবের একজন ঠিকাদার। তাদেরকে নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করার জন্য একাধিকবার বলা হলেও তারা তা মানেননি।”

জানা যায়, রাস্তা, ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণকাজের অনিয়ম নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের প্রায়ই নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়। কখনো কখনো স্থানীয় নেতাদের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সাংবাদিকরা যদি বাধাহীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের কাছে এসব অনিয়ম তুলে ধরতে পারেন, তাহলে রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণকাজে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *