সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

গাইবান্ধায় তীব্র শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন

গাইবান্ধায় তীব্র শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন

বায়েজিদ, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) : উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় জানুয়ারির শুরুতেই জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। হিমেল বাতাস ও ঘন কুয়াশায় অবশ হয়ে পড়ছে মানুষের হাত-পা। এতে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। টানা কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। রাতভর ও দিনের বেলাতেও বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে ঘন কুয়াশা, সঙ্গে বইছে উত্তরের শীতল বাতাস। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, শিশু ও বয়স্করা। শীতের কারণে পুরো জেলায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা হিম শীতল বাতাস ও ঘন কুয়াশার কারণে আগামী আরও দুদিন শীতের তীব্রতা অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময় সূর্যের দেখা না মিললে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভোরের আগেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে সড়ক, মাঠ ও জনপদ। অনেক সময় কয়েক হাত দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশা ও তীব্র ঠান্ডার কারণে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে দিনের বেলাতেও লাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করছে যানবাহন। শীত নিবারণের জন্য গ্রামের মানুষ খড়কুটো, শুকনো পাতা ও কাঠ জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছেন। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আগুনের পাশে বসে হাত-পা সেঁকে নেওয়াই এখন নিত্যদিনের চিত্র। তবে এতে ধোঁয়ার কারণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

মানুষের পাশাপাশি শীতে চরম কষ্টে রয়েছে গবাদিপশুরাও। বাথান ও গোয়ালে থাকা গরু-ছাগল কাঁপতে কাঁপতে রাত পার করছে। পলাশবাড়ী উপজেলার উদয়সাগর গ্রামের খামারি সাহারুল ইসলাম জানান, তীব্র শীতে পশুর খাবার গ্রহণ কমে গেছে এবং দুধ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এতে তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রয়েছে নিম্ন আয়ের দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও ছিন্নমূল পরিবারগুলো। শীতের কারণে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয়ও হ্রাস পেয়েছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে অনেকেই কুয়াশাভেজা ঠান্ডার মধ্যেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এদিকে শিশু ও বয়স্করা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতায় বাড়ছে হাসপাতালে রোগীর চাপ। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, বাতব্যথা ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রকোপ।

পলাশবাড়ী উপজেলার উদয়সাগর গ্রামের আনোয়ারা বলেন, কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। শীতে হাত-পা টাটাচ্ছে। খুব কষ্টে দিন কাটছে।

একই গ্রামের হালিমা বেগম বলেন, রাতদিন কুয়াশা ঝরছে। ঠান্ডা বাতাসে হাত-পা কেটে নেওয়ার মতো লাগে। তাই আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছি।

সুলতানপুর বাড়াইপাড়া গ্রামের কোনা বেলাল মিয়া বলেন, আমরা গরিব মানুষ, তেমন শীতের কাপড় নেই। এই ঠান্ডায় খুব কষ্টে আছি। তিনি শীতবস্ত্র সহায়তার দাবি জানান।

ভেলাকোপা গ্রামের শারমিন জাহান বলেন, এই শীতে শুধু মানুষ নয়, গরু-ছাগলেরও প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। অনেক পশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক ডা. সোহেল বলেন, শীতের সময় সবাইকে গরম কাপড় পরিধান করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ঠান্ডা ও বাসি খাবার পরিহার এবং শিশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার কথা বলেন।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসিফ উর রহমান বলেন, শীতে শিশু রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। বাইক চালকদের চেস্টগার্ড ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরিধান ও বিনা প্রয়োজনে বাইরে না থাকার আহ্বান জানান তিনি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, কম্বল কেনার জন্য জেলার প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ছয় লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জেলায় ২২ হাজার ৬০০ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।

গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব সরকার বলেন, শীতের শুরু থেকেই জেলায় শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এনডিসি) সাব্বির আহমেদ বলেন, আমাদের গাড়িতে সবসময় কম্বল থাকে। যেখানেই যাই, প্রয়োজন মনে হলে সেখানেই কম্বল বিতরণ করি।

আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, এমন বৈরী আবহাওয়া আগামী আরও দুদিন থাকতে পারে। এ সময় ঠান্ডা বাতাসের তীব্রতা অপরিবর্তিত থাকবে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *