প্রতিপক্ষের হুমকির মুখে দুই সন্তান নিয়ে বাড়িঘরছাড়া প্রবাসীর স্ত্রী, দুই শিশুর পড়াশোনা অনিশ্চিত
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে আসন্ন উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থী হওয়া নিয়ে প্রতিবেশীদের অব্যাহত হুমকি-ধমকিতে এক সৌদি আরবপ্রবাসীর দুই শিশু সন্তানের লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম হয়েছে। প্রতিপক্ষের ভয়ে স্কুলে যেতে না পারায় ৯ বছর বয়সী শিশু আদিবা তাবাসসুম ও ১৩ বছর বয়সী মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফির শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উছমানপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন স্থানীয় ইউসুফ আলীর ছেলে ও কুলিয়ারচর বাজারের মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী পারভেজ মিয়া (৩৪)। অন্যদিকে, একই ওয়ার্ড থেকে মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন সৌদি আরবপ্রবাসী মো. কাদির মিয়াও। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পারভেজ মিয়া সৌদি প্রবাসী কাদির মিয়াকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেন। কাদির মিয়া রাজি না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনার জের ধরে পারভেজের পক্ষে একই গ্রামের মৃত জাফর আলীর ছেলে মো. সেতু মিয়া ও তাঁর লোকজন সৌদি প্রবাসী কাদির মিয়ার পরিবারকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন। প্রবাসীর বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ আগস্ট দুপুর ১টা ৩৭ মিনিটে সেতু মিয়ার পক্ষের ফুল নাহার ও অজুফা বেগম লাঠি নিয়ে কাদির মিয়ার বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং প্রবাসীর দুই শিশুকে হত্যার হুমকি দেন। এ সময় প্রবাসীর স্ত্রী রাবেয়া বসরির হাত থেকে আনুমানিক দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি আইফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন ফুল নাহার। ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরায় ধারণ করা রয়েছে বলে জানান প্রবাসীর স্ত্রী রাবেয়া বসরি।
এখানেই শেষ নয়। রাবেয়া বসরি আরও বলেন, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে শিশু দুটিকে নিয়মিত পথরোধ করে হত্যা ও গুম করার হুমকি দিচ্ছেন পারভেজ, সেতু মিয়া, ফুল নাহার ও অজুফা বেগম। ফলে আতঙ্কে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে শিশুরা। উল্লেখ্য, আদিবা তাবাসসুম স্থানীয় ৫১ নম্বর নাজির দিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফি কুলিয়ারচর উদয়ন কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

প্রবাসীর স্ত্রী রাবেয়া বসরি ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী প্রবাসে থাকায় বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। প্রতিপক্ষরা এই সুযোগে প্রতিনিয়ত আমাকে ও আমার কোমলমতি সন্তানদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। ওদের ভয়ে বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি বাড়িতে এসে তারা আমার ফোন ভেঙে ফেলেছে। আমরা এখন চরম আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র দিন কাটাচ্ছি। বর্তমানে আমার দুই শিশু সন্তানের লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, তাঁদের হুমকি-ধমকির কারণে বাদী হয়ে গত ৭ অক্টোবর আফজাল মিয়া (২৮), শিপা বেগম (২৩) ও মোছা. জোসনা বেগম (২৮) নামে তিনজনের বিরুদ্ধে কুলিয়ারচর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। সাধারণ ডায়েরি নম্বর-৩১৫।
এর আগে তিনি বাদী হয়ে গত ২২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭/১১৪/১১৭(সি) ধারায় পারভেজ মিয়া, সেতু মিয়া, কাইয়ুম মিয়া, ফুল নাহার, অজুফা বেগম ও সেলিনা বেগমের বিরুদ্ধে একটি মোকদ্দমা দায়ের করেছেন। মোকদ্দমা নম্বর-৫৬১।
স্কুলছাত্রী আদিবা তাবাসসুম বলে, “আমার সঙ্গে দেখা হলে সেতু মিয়া বলেন, ‘তোর বাবা চেয়ারম্যানি করবে, মেম্বারি করবে? তোকে আর তোর বাবাকে মেরে ফেলব।’ এরপর থেকে আমি আর স্কুলে যাই না।”
স্কুলছাত্র মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফি বলে, পারভেজের সঙ্গে একটি অটোরিকশায় দেখা হলে তিনি বলেন, ‘কিরে, তোর বাপে মেম্বারি করব? রাখ, মেম্বারি করাইতেছি। তোর বাপেরেও লটকাইয়া বাইরাইয়াম, তোরেও লটকাইয়া বাইরাইয়াম। তোরে আরও বেশি কষ্ট দিয়ে মারুম।’ এ কথাগুলো তিনি আমাকে তিন দিন বলেছেন। তিন দিন পর আমি স্কুলে গিয়ে এক স্যারকে বিষয়টি বলেছি। পরে স্যার আমাকে স্কুল থেকে বাড়িতে দিয়ে যান। এরপর থেকে আমি ভয়ে আর স্কুলে যাই না। আমি লেখাপড়া করতে চাই।
পুরুষশূন্য প্রবাসীর পরিবারটির ওপর এমন অন্যায়-অত্যাচার এবং শিশুদের শিক্ষাজীবন রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
এ বিষয়ে জানতে কুলিয়ারচর উদয়ন কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড স্কুলের প্রধান শিক্ষক সলিল কান্তি রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফি কুলিয়ারচর উদয়ন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। হুমকি-ধমকির বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষকে ডেকে এনে মীমাংসা করে দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, স্কুলটির সহকারী শিক্ষক ওয়াসিম চৌধুরী বলেন, মাহমুদুল হাসান প্রায় ১৭-১৮ দিন ধরে স্কুলে আসছে না। তিনি সাংবাদিকদের আরও বলেন, মাহমুদুল হাসান তাঁদের স্কুলের একজন মেধাবী ছাত্র। তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, পারিবারিক সমস্যার কারণে মাহমুদুল হাসান ভয়ে গৃহবন্দি হয়ে আছে। অনেক দিন ধরে স্কুলে না আসায় তার লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক গত ৯ সেপ্টেম্বর মাহমুদুল হাসানকে বিদ্যালয় থেকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর থেকে সে স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। প্রতিপক্ষের হুমকি-ধমকির ভয়ে ছেলেটির লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পথে।
অন্যদিকে, নাজির দিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সন্ধ্যা রাণীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আদিবা তাবাসসুম তাঁদের স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সে অনেক দিন ধরে স্কুলে আসছে না। কেন আসছে না, সে বিষয়ে কোনো উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মো. পারভেজ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, তিনি আসন্ন উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একজন মেম্বার পদপ্রার্থী। সৌদি আরবপ্রবাসী মো. কাদির মিয়াও একই ওয়ার্ডের একজন মেম্বার প্রার্থী। তবে তাঁদের মধ্যে মেম্বার প্রার্থিতা নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। এমনকি প্রবাসী কাদির মিয়ার দুই শিশুসন্তানকে তিনি বা তাঁর লোকজন কোনো ধরনের হুমকি-ধমকি দেননি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত সেতু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। তিনি কাদির মিয়ার দুই শিশুকে কোনো দিন দেখেননি, চেনেনও না। তাদের কিংবা তাদের মাকে হুমকি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি বলেন, আমি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একজন মেম্বার প্রার্থী। পারভেজ এবং কাদির মিয়াও মেম্বার প্রার্থী। জনগণ যাকে ভোট দেবে, তিনিই মেম্বার হবেন। এখানে একজনকে আরেকজন বাধা দেওয়ার কী আছে?
এ ব্যাপারে কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাবেয়া বসরি নামে এক নারীর থানায় সাধারণ ডায়েরি করার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সাধারণ ডায়েরিটি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাধারণ ডায়েরি নম্বর-৩১৫-এর তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসআই (নিরস্ত্র) আবু কায়সারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাধারণ ডায়েরিটির তদন্তের অনুমতির জন্য গত ৮ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাফফাত আরা সাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

