মো. শাহাদাত হোসেন: উন্নয়ন একটি দেশের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান সূচক। তবে উন্নয়ন তখনই প্রকৃত অর্থে সফল ও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সুফল বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সমানভাবে ভোগ করতে পারে। শুধু উঁচু সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক, দৃষ্টিনন্দন ভবন কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে উন্নয়নের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানুষের শিক্ষা, দক্ষতা, নৈতিকতা, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা, সুশাসন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর। তাই আজ আমাদের নিজেদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন- আমরা কি সত্যিই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলছি, নাকি তাদের জন্য আরও জটিল সংকটের ভিত্তি তৈরি করছি?
বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধার (Demographic Dividend) এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। আগামী কয়েক দশকে এই তরুণরাই অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতের নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা না যায়, তাহলে জনসংখ্যা আশীর্বাদের পরিবর্তে বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই বাস্তবতায় শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এখনও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর। অথচ বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের ধরন আমূল পরিবর্তন করছে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে প্রয়োজন হবে বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, গবেষণামনস্কতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। তাই সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে দক্ষতাভিত্তিক ও সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না। এর ফলে হতাশা, দক্ষ জনশক্তির অপচয় এবং বিদেশমুখী প্রবণতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, শিল্প ও শিক্ষার কার্যকর সমন্বয় এবং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি।
একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা উচিত। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমি ভরাট, অবৈধভাবে মাটি কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের কারণে কৃষিজমি দ্রুত কমে যাচ্ছে। এটি শুধু কৃষকের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন। কৃষিজমি কমতে থাকলে একসময় দেশ খাদ্য আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। বৈশ্বিক যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সময়ে এই নির্ভরশীলতা ভয়াবহ ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই উন্নয়নের নামে কৃষিজমি ধ্বংস নয়; প্রয়োজন পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিজমি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশের জন্য আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি এবং তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন-জীবিকা ও কৃষিকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, বন রক্ষা, নদী দখলমুক্ত রাখা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
প্রযুক্তির বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি নতুন ধরনের সংকটও সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, ভুয়া তথ্য, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আসক্তি তরুণ সমাজকে নানামুখী ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ব্যবহার, তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল নাগরিকত্বের শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও উদ্বেগজনক। দুর্নীতি, অনিয়ম, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং দায়িত্ববোধের অভাব একটি জাতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু জ্ঞান বিতরণের নয়, নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
সুশাসন ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আজকের নীতিনির্ধারণ, আজকের বিনিয়োগ এবং আজকের মূল্যবোধ। আমরা যদি শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, সুশাসন এবং নৈতিকতার মতো মৌলিক খাতগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই, তাহলে আগামী প্রজন্ম একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল এবং মানবিক বাংলাদেশ পাবে। কিন্তু যদি উন্নয়নকে কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি এবং মানুষ গড়ার বিনিয়োগকে অবহেলা করি, তাহলে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না।
আজকের শিশুদের হাতে শুধু আধুনিক নগরায়ণ নয়; তুলে দিতে হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। কারণ একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার মানুষ। আর সেই মানুষকে গড়ে তোলার কাজ আজ শুরু না করলে আগামীকাল অনেক দেরি হয়ে যাবে।
আগামী প্রজন্ম আমাদের কাছে কেবল সম্পদ নয়, একটি পবিত্র আমানত। সেই আমানতের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াই হোক রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার। তাহলেই আজকের উন্নয়ন আগামী দিনের সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি হয়ে উঠবে।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

