মুহাম্মদ কাইসার হামিদ (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলা-এর গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের পূর্ব গোবরিয়া (পূর্বপাড়া) গ্রামে লেয়ার মুরগির খামারের বিষ্ঠার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে গ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় লেয়ার মুরগির দুটি খামার স্থাপন করা হয়েছে।
খামারের মুরগির বিষ্ঠার দুর্গন্ধ থেকে প্রতিকার পেতে গত ১৯ মে, মঙ্গলবার মুরগির খামার অপসারণ ও আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী হোসেন আলী (৬২)। তিনি উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের পূর্ব গোবরিয়া (পূর্বপাড়া) গ্রামের মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে।
লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, তার পার্শ্ববর্তী বাড়ির মৃত মো. রজব আলীর পুত্র মো. সাইফুল ইসলাম (৫০) ও মো. দ্বীন ইসলাম (৫৫) দীর্ঘদিন ধরে তাদের বাড়ি সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে দুটি লেয়ার মুরগির খামার স্থাপন করে মুরগি পালন করে আসছেন।
এর ফলে মুরগির খামারের বর্জ্যের দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ওই খামারের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে হোসেন আলীর বসতবাড়ি ও ফসলি জমির পাশে। শুধু তাই নয়, খামারের ডিমের খোসা, নষ্ট ডিম, মরা মুরগি ও মুরগির বিষ্ঠা হোসেন আলীর বাড়ির পাশে ফেলার কারণে এসব বর্জ্যের পচা পানি আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসী ও পথচারীদের।
এ ছাড়া পচা বর্জ্য পানিতে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে তাদের কৃষিজমিসহ পাশের অন্যান্য কৃষিজমিতে। ফলে স্থানীয় কৃষকরা দূষিত পানির কারণে বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। নষ্ট হচ্ছে হোসেন আলীর জমিসহ প্রতিবেশী কৃষকদের ফসল ও ফসলি জমি। হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
হোসেন আলী তার লিখিত আবেদনে আরও উল্লেখ করেন, সম্প্রতি পচা বর্জ্যের দূষিত পানিতে তার ১৮ শতাংশ বাদাম ক্ষেত, ১৪ শতাংশ ধানক্ষেত ও ৪ শতাংশ চালকুমড়ার বাগান নষ্ট হয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। অন্যান্য কৃষকেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া তিনি আরও জানান, খামারের মুরগির বিষ্ঠার দুর্গন্ধে তার স্ত্রী সমুজা বানু (৪৫) ও তার মাদ্রাসাপড়ুয়া মেয়ে জান্নাত (১৩)সহ প্রতিবেশীরা প্রতিনিয়ত বমি করছেন। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়রিয়া হওয়ার কারণে তার স্ত্রীকে দুইবার কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়েছে।
মুরগির বিষ্ঠার দুর্গন্ধে তার মেয়ে বাড়িতে খাবার খেতে পারছে না। অন্যত্র পাঠিয়ে খাবার খাওয়াতে হচ্ছে। প্রতিবেশীরাও ভালোভাবে খাবার খেতে পারছেন না। পেট ফুলে যাচ্ছে। স্থানীয় মসজিদের মুসল্লিরা ঠিকমতো নামাজ পড়তে পারছেন না। পথচারীদের নাকে কাপড় দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এলাকার পানি দূষিত হয়ে কালচে আকার ধারণ করেছে। যার কারণে বায়ু ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আসাদুল হক মঞ্জু, জজ মিয়া মাস্টার, মহিউদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও মধু মিয়াসহ এলাকার অনেককে তাদের এ কষ্টের কথা জানিয়ে এবং খামার এলাকা দেখিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি ভুক্তভোগীরা।
গ্রামের বাসিন্দা হাছেন আলী বলেন, আমার বাড়ির পাশেই খামার। বিষ্ঠা থেকে সব সময় দুর্গন্ধ ছড়ায়। আশপাশে বসবাস করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ঠিকমতো খাবার খেতে পারছি না। বমি বমি লাগে। অনেক সময় বমি করে দিতে হয়। আমরা এর প্রতিকার চাই।
মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্রী জান্নাত বলে, “মুরগির বিষ্ঠার দুর্গন্ধে আমি বাড়িতে খেতে পারি না, পড়তে ও থাকতে পারি না। অন্যত্র গিয়ে খেতে হয়। বাড়িতে থাকলে বমি বমি লাগে। অনেক কষ্ট হয়।”
জানা যায়, খামারটি স্থাপনে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর-এর অনুমতি নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া আবাসিক এলাকায় অবস্থিত খামারের বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থাও নেই। খামারটি স্থাপনের ক্ষেত্রে জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০০৮ মানা হয়নি বলেও জানা যায়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে পূর্ব গোবরিয়া (পূর্বপাড়া) গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, খামারটির আশপাশে মুরগির বিষ্ঠা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। খামারের তিনপাশে বসতবাড়ি। এসব বাড়ি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এক পাশে বাদাম, ধান ও চালকুমড়ার ক্ষেত। এসব ক্ষেত অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
বর্তমানে একটি খামারে প্রায় ১ থেকে দেড় হাজার মুরগি রয়েছে। এসব মুরগির বিষ্ঠার কারণে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। দুর্গন্ধে খামারের চারদিকে মানুষের বসবাস দায় হয়ে পড়েছে। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী, একটি মুরগির খামার স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ও প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং জনগণের ক্ষতি হয়, এমন স্থানে খামার স্থাপন করা যাবে না। এসব কোনো নিয়মই মানা হয়নি এখানে।
অভিযুক্ত খামার মালিক মো. সাইফুল ইসলাম (৫০) বলেন, আমি গরিব মানুষ। বাড়ির ভেতরে একটি লেয়ার মুরগির খামার করেছিলাম, সেটি আমি বন্ধ করে দিয়েছি। খাঁচা বিক্রি করে দেব। সেখানে ব্রয়লার বা অন্য কিছু করব। লেয়ার মুরগি আর তুলব না। আর বাড়ির পেছনের খামারটি অনেক টাকা বিনিয়োগ করে করেছি। এই খামারের আয় দিয়েই আমার সংসার চলে। প্রায় তিন বছর ধরে এখানে লেয়ার মুরগি পালন করছি। ঝড়ে রাস্তায় গাছ পড়ে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল করতে পারেনি, তাই বিষ্ঠা সরাতে পারিনি। বৃষ্টির পানিতে ছড়িয়ে গিয়ে সমস্যা হয়েছে। অচিরেই গর্তে মাটি ভরাট করে বিষ্ঠাগুলো চাপা দেওয়া হবে।
মো. ইয়াসিন খন্দকার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), হোসেন আলীর দাখিল করা লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে পাঠানো হয়েছে।

