লেখক: মুহাম্মদ রাশেদ খান
সহযোগী সম্পাদক
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা
* জুলাই বিপ্লবের ভিত্তি হলো ভারতীয় আধিপত্য ও আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম ও যুদ্ধ। অধিকন্তু, জুলাই-আগস্টের যুদ্ধে প্রতিপক্ষ ছিল ভারত ও তার মিত্র আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠন এবং ১৪ দলের দালাল শ্রেণি। তারা সরাসরি জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সশস্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছিল এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিল।
জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে সরাসরি ভারতীয় সামরিক বাহিনীর একটি প্রশিক্ষিত অগ্রবর্তী অপারেশন উইং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত। ভারতের এদেশীয় দালাল আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা এখনও বেপরোয়া এবং তাদের অপকর্মের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। তারা এখনও ভারতের সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে এবং সুপরিকল্পিতভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
আওয়ামী লীগ ও তাদের পলাতক সহযোগী গোষ্ঠীর প্রায় সব নেতা-কর্মী ও সমর্থক ভারতের আশ্রয়ে অবস্থান করছে। বর্তমানে ভারত ও ভারতের কট্টর হিন্দু উগ্রবাদী সরকারকে বাংলাদেশের একমাত্র শত্রু হিসেবে পরিগণিত করা হচ্ছে, এমন মতও উপস্থাপিত হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ থাকলেও ভারতকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র, কিন্তু শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। কাজেই সেই ভারতীয় আধিপত্য ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অরাজনৈতিক ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বর্ণিত আওয়ামী লীগের সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার তুলনায় কম বীরত্বপূর্ণ বলা যায় না, এমন দাবি করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরবর্তীতে ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন করে দেশপ্রেমিক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং বিরোধী মতের মানুষের অধিকার হরণ করেছে, এমন অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিগত ৫৪ বছরে জাসদের ২৫-৩৬ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুমের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া বহু ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে, যার দায় অন্যদের ওপর চাপানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
মুজিব বাহিনীকে ভারতের মাটিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছে- এমন কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশি-বিদেশি একটি চক্রের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা ও মুক্ত করার লড়াই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বর্ষাবিপ্লবের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম ছিল পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে জনগণের মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই। ভুট্টো ও তাঁর অনুগত রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করায় মূলত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। এই যুদ্ধে প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তি।
উল্লেখ করা হয়েছে, সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের কিছু রাজনৈতিক দল, যেমন জামায়াতে ইসলামী, একক পাকিস্তান রাষ্ট্র বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের মতে, পাকিস্তান ভেঙে গেলে নতুন রাষ্ট্র ভারতীয় প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই তারা ওই অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে এই আশঙ্কা আংশিকভাবে সত্য হয়েছে- এমন দাবিও উত্থাপন করা হয়েছে।
ভারতের তৎকালীন সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেনা প্রত্যাহারে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সেনা প্রত্যাহার করে- এমন ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীকালে, কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘রাজাকার’ ইস্যুকে ব্যবহার করে সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে এবং রাষ্ট্র গঠনে বাধা সৃষ্টি করেছে- এমন অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
এমতাবস্থায় বলা হয়েছে, জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব একাধিকবার তাদের অতীত রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অযৌক্তিক বলে দাবি করা হয়েছে।
সবশেষে বলা হয়েছে, এই দুটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব ছিল না। এখনও দেশ ভারতীয় প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ দালাল শ্রেণির কারণে হুমকির মুখে রয়েছে- এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।

