সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

নান্দনিক মসজিদের আড়ালে ইমাম-মুয়াজ্জিনের কঠিন জীবনযুদ্ধ

নান্দনিক মসজিদের আড়ালে ইমাম-মুয়াজ্জিনের কঠিন জীবনযুদ্ধ

বিজয়নগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার রসুলপুর গ্রামের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রসুলপুর পশ্চিম পাড়া জামে মসজিদ- গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহৎ মসজিদ। প্রায় ৩৬ বছর আগে বাঁশের চাটাই ও ছন দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই মসজিদটি আজ নান্দনিক টাইলস ও আধুনিক স্থাপনায় দৃষ্টিনন্দন রূপ পেয়েছে। তবে মসজিদের এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের জীবনসংগ্রামের গল্প রয়ে গেছে অনেকটাই অজানা।

মসজিদের মুয়াজ্জিন ৬২ বছর বয়সী সমরুজ মিয়া। তিনি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে মসজিদের খেদমতে নিয়োজিত। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেওয়া থেকে শুরু করে মসজিদের নানা দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

৯ সদস্যের বড় পরিবার তার। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে প্রতি সপ্তাহে তিনি মসজিদপাড়া থেকে পায়ে হেঁটে মুষ্টি চাল সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি মসজিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও নিজ হাতে করেন। অথচ এসব দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না।

অন্যদিকে মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ কারী ফয়সল আহমেদ। তিনি আলিম পাস এবং একইসঙ্গে পবিত্র কোরআনের হাফেজ। প্রায় ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে ইমামতি করার পর বর্তমানে রসুলপুর পশ্চিম পাড়া জামে মসজিদে দায়িত্ব পালন করছেন।

মাত্র ৯ হাজার টাকা মাসিক বেতনে ৫ সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে তার পরিবার। কন্যা তৃতীয় শ্রেণিতে এবং এক ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। আরেক সন্তান এখনো দুধের শিশু।

ইমাম ফয়সল আহমেদ বলেন, আমার মাসিক বেতন ৯ হাজার টাকা। কিন্তু সংসারের খরচ ১৫ হাজার টাকারও বেশি। সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে প্রায়ই ধার-দেনা করতে হয়।

তার সংসার চলে মসজিদের বেতন, কিছু টিউশনি এবং সামান্য হাদিয়ার ওপর নির্ভর করে। মসজিদের বেতনের প্রধান উৎস হলো গ্রামের মানুষের দেওয়া মুষ্টি চাল, দানবাক্সের টাকা এবং পরিবারপ্রতি বাৎসরিক স্বল্প হাদিয়া।

সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে ইমাম হাফেজ কারী ফয়সল আহমেদ বলেন, আমাদের যদি প্রাইমারি শিক্ষকের সমমানের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হতো, তাহলে আমরা সম্মানের সঙ্গে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করতে পারতাম। অন্তত ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হতো না। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের এই বোবা কান্না দেখেও যেন দেখার মতো কেউ নেই। কবে আমাদের এই ভাগ্যের পরিবর্তন হবে- সেই আশায় দিন পার করছি।

গ্রামের সবচেয়ে বড় ও কেন্দ্রীয় মসজিদে দায়িত্ব পালন করেও ইমাম ও মুয়াজ্জিনের এমন মানবেতর জীবন নিয়ে এলাকাবাসী মনে করেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার জন্য দায়িত্বশীলদের জীবনমান নিশ্চিত করা জরুরি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রসুলপুর পশ্চিম পাড়া জামে মসজিদের বাহ্যিক চাকচিক্য যতই বাড়ুক, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের জীবনমান না বাড়লে সেই উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *