শফিকুল ইসলাম, তালা (সাতক্ষীরা): ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে তালার ভূয়া মহিলা মেম্বার জুলেখার একের পর এক প্রতারণায় অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। উপজেলা পিআইও অফিসের অফিস সহায়ক সোহেল রানার সহযোগিতায় জুলেখা কোনো অফিসে কাজ না করলেও সারাদিন অফিসপাড়ায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। প্রায়ই উপজেলা পিআইও অফিস ও নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঘোরাফেরা করে সে। তার এই অপকর্মের ছায়াসঙ্গী জালালপুর ইউপির সদস্যা ফিরোজা খাতুন। এই দুজন মিলে পুরো উপজেলায় চষে বেড়ায় বলে জানা গেছে।
বছরের পর বছর নিজেকে ইউপি সদস্য পরিচয় দিয়ে সরকারি ঘর, টিন, টিউবওয়েল, পানির ট্যাঙ্কিসহ বিভিন্ন অনুদান পাইয়ে দেওয়ার শর্তে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ঠকিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সোহেল রানা ও জুলেখা নামের এই চক্রটি।
তালা উপজেলার মহান্দী গ্রামের মৃত আবুল শেখের মেয়ে ও হাজরাকাটি গ্রামের শেখ আরিজুল ইসলামের স্ত্রী জুলেখা বেগম সরকারি অনুদান পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে বারুইহাটী গ্রামের দিনমজুরের স্ত্রী পারভীনা, আটারই গ্রামের লিলিমা, রহিমাবাদের বৃদ্ধা রাবেয়া, তালা সদরের রাশিদা, ইসলামকাটি গ্রামের রজব আলী, ক্ষান্ত বিবি, পরানপুর গ্রামের মইনুল ইসলাম, নাংলা গ্রামের কৃষক হাসেম আলীসহ অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারী অনুদানের লোভ দেখিয়ে টাকা নেওয়ার পর এখন তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে উল্টো দুর্ব্যবহার করেন। তারা এর বিচার দাবি করেন।
জুলেখা তার সৎবোন ও আওয়ামী লীগের নেতা সিরাজুলের স্ত্রী লিলিমার যোগসাজশে তালা উপজেলার রহিমাবাদ গ্রামের মৃত আনার আলী জমাদ্দারের ছোট পুত্র, বিদেশফেরত কোহিনুর জমাদ্দারের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ প্রায় ৩৪,০০,০০০/- (চৌত্রিশ লক্ষ) টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, এর ফলে কোহিনুর সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, জুলেখা এর আগে তার এলাকায় দুইবার মেম্বার পদে নির্বাচন করে জামানত বাজেয়াপ্ত হলেও নিজেকে মহিলা মেম্বার পরিচয় দিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছেন।
এর আগে জুলেখা নামের চক্রটি দোহার এলাকায় টিউবওয়েল দেওয়ার কথা বলে শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ২ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ভুক্তভোগীরা বলেন, প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা তিনি কখনও ফেরত দেন না। দরিদ্র মানুষ এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিসের টাকা? চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি। এখন আমার কিছু করার নেই—যা পারেন করেন। অসুস্থ মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া, গরিব মানুষের ঘর বানিয়ে দেওয়া, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় অনুদান এনে দেওয়া, এমনকি বৃদ্ধদের বয়স্কভাতা ও বিধবা ভাতার টাকা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বোনজামাই আওয়ামী ক্যাডার সিরাজুলের সহযোগিতা ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জুলেখা পার পেয়ে যেতেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে তিনি এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তারা অবিলম্বে জুলেখাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান।
অভিযুক্ত জুলেখা বেগম বলেন, জিআর প্রকল্পের যে চাল পেয়েছিলেন, তা মসজিদে বুঝিয়ে দিয়েছেন। টিন, চাল, বয়স্কভাতা দেওয়ার কথা বলে কোনো টাকা নেননি বলে দাবি করেন তিনি। পিআইও অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগও অস্বীকার করেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের অফিস সহায়ক সোহেল রানা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জুলেখা তো কোনো মেম্বার নন। তিনি কেন অফিসে বসে থাকবেন? প্রয়োজন হলে কাজে আসেন, কাজ সেরে চলে যান।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আশরাফ হোসেন বলেন, আমার নাম ভাঙিয়ে যদি কেউ টাকা নিয়ে থাকে, তাহলে ইউএনও বরাবর লিখিত আবেদন করুন। তাহলে তদন্ত হবে এবং বিচার পাওয়া যাবে। অহেতুক আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই।

