সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

গ্লোবাল সিড ভল্ট- ভবিষ্যৎ পৃথিবীর শস্য নিরাপত্তা ভান্ডার

গ্লোবাল সিড ভল্ট- ভবিষ্যৎ পৃথিবীর শস্য নিরাপত্তা ভান্ডার, কালের বার্তা

ডেস্ক: পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দূরে আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জের গভীরে অবস্থিত স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভোল্ট (Svalbard Global Seed Vault), যা “ডুমস ডে ভল্ট” নামেও পরিচিত, বর্তমানে বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, যুদ্ধ, অথবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঘটনায় ফসল বা শস্যের জাত সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেলে, তা আবার ফিরিয়ে আনার জন্য এখানে খাদ্যশস্যের বীজ সুরক্ষিত রাখা হয়।

গ্লোবাল সিড ভোল্টের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো বিশ্বের খাদ্যশস্যের জিনগত বৈচিত্র্যকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য ভোল্ট কর্তৃপক্ষ ও সহযোগী সংস্থাগুলি একাধিক পরিকল্পনা ও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে:

ভোল্টের প্রধান কাজ হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জিনব্যাঙ্ক (genebank) থেকে বীজ সংগ্রহ করে সেগুলির প্রতিলিপি বা ডুপ্লিকেট এখানে সংরক্ষণ করা। এই সংগ্রহ প্রক্রিয়া অবিরাম চলছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোল্টটি ১৫ বছর পূর্ণ করেছে এবং ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১.৩ মিলিয়ন (১৩ লক্ষাধিক) বীজের নমুনা এখানে সংরক্ষিত হয়েছে, যার মোট ধারণক্ষমতা হলো ৪.৫ মিলিয়ন (৪৫ লক্ষ) নমুনার। সাম্প্রতিক সময়েও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জিনব্যাঙ্কগুলি থেকে নতুন বীজ জমা দেওয়া হয়েছে, যা এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।

গ্লোবাল সিড ভোল্ট মূলত এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে পারমাফ্রস্ট (permafrost – চিরস্থায়ী বরফ) প্রাকৃতিক ভাবে ঠান্ডা বজায় রাখতে পারে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পারমাফ্রস্টের গলন এবং অপ্রত্যাশিত জল প্রবেশ করার মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, ভোল্ট কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালে প্রবেশ পথের টানেলে সংস্কার ও আপগ্রেডেশন এর কাজ শুরু করে, যা ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ হয়। ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও যাতে বীজগুলি সুরক্ষিত থাকে, তার জন্য টানেলকে জলরোধী (watertight) করা হয়েছে এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হয়েছে। এটিই ভোল্টের স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রধান পরিকল্পনা।

ভোল্ট কেবল বিপর্যয়ের জন্যই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন জিনব্যাঙ্কের ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের যে সমস্ত জিনব্যাঙ্ক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের ফলে নিজেদের বীজ সংরক্ষণাগার হারিয়েছে, তারা স্বালবার্ড থেকে তাদের সংরক্ষিত বীজের প্রতিলিপি ফিরিয়ে নিয়ে পুনরায় চাষ ও গবেষণা শুরু করতে পেরেছে। যেমন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আলেপ্পোর জিনব্যাঙ্ক ভোল্ট থেকে বীজ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত বীজ সরবরাহ করে খাদ্যশস্যের বৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা এর অন্যতম লক্ষ্য।

ভোল্টটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এটি দেশ, জিনব্যাঙ্ক এবং এমনকি স্থানীয় আদিবাসী গোষ্ঠীগুলিকেও (যেমন চেরোকি নেশন) তাদের গুরুত্বপূর্ণ শস্যের বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করছে।

গ্লোবাল সিড ভোল্টকে “বিশ্বের চূড়ান্ত বীমা নীতি” হিসাবে দেখা হয়, যা বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি সুরক্ষিত রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেখানে ফসলগুলি নতুন নতুন রোগ ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, সেখানে এই সংরক্ষিত বীজগুলি উদ্ভিদ প্রজননকারী ও বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যতের জন্য আরও স্থিতিশীল (resilient) ও অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন শস্য উদ্ভাবনে সাহায্য করবে।

সংক্ষেপে, গ্লোবাল সিড ভোল্ট তার মূল লক্ষ্য- বিশ্বের খাদ্য ফসলের জিনগত বৈচিত্র্যের সুরক্ষা বজায় রেখে চলেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখছে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *