নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্ষার দিন মানেই এক ভিন্ন চিত্র, একদিকে যখন ঘরে ঘরে খিচুড়ি-মাংসের আয়োজন চলে, অন্যদিকে শহর ও পৌর অঞ্চলের বাসিন্দাদের একটা বড় অংশকেই ডুবে থাকতে হয় জলাবদ্ধতার চরম দুর্ভোগে। প্রতি বছর এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপচে পড়ে জলমগ্ন রাস্তা আর জনজীবনের বিপর্যস্ত অবস্থার ছবি-ভিডিও। এই নিত্য সমস্যার মূলে যেমন রয়েছে পৌর প্রশাসনের ভূমিকা, তেমনি প্রকট হয়ে উঠছে নাগরিকদের দায়বদ্ধতা ও অসহযোগিতার অভাব।
পৌর বা শহর অঞ্চলের জল নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও প্রায়শই তাঁদের পড়তে হয় কঠিন বাধার মুখে। নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন সাহেবের টিমের মতো কর্মীরা নর্দমা পরিষ্কার করা বা পাইপ ড্রেনেজের ব্যবস্থা করতে ছুটোছুটি করলেও এই কাজ করতে গিয়ে তাঁদের পদে পদে সম্মুখীন হতে হয় ভিলেজ পলিটিক্সে, জায়গা নিয়ে বিরোধ এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাতের।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালী বা সাধারণ নাগরিকরা নিকাশির কাজে অসহযোগিতা করেন, এমনকি ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। ড্রেনেজ পাইপ বসানোর জন্য সামান্য জায়গা ছাড়তেও ঘোর আপত্তি ওঠে, যার ফলস্বরূপ নিকাশি ব্যবস্থা তৈরির কাজ থমকে যায়। এই ধরনের অসহযোগিতার প্রমাণ শহরজুড়ে অসংখ্য।
শহরের নির্মাণশৈলী এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বই যেন জলাবদ্ধতার মূল কারণ। বেশিরভাগ নাগরিকই রাস্তার সীমানা চেপে সর্বোচ্চ ২.৫ থেকে ৩ ফুট পথ ছেড়েই বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ করেন। কিন্তু এর বিপরীতে, বৃষ্টির জল নিষ্কাশনের জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থাও রাখেন না।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, পৌরসভা যখন ড্রেনেজ পাইপ বসানোর উদ্যোগ নেয়, তখন সেই পাইপটুকুও নিজেদের ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে যেতে দিতে চান না কেউই। অথচ, সবারই এক গৎবাঁধা অভিযোগ- পৌরসভা কোনো সেবা দেয় না। নাগরিক পরিষেবা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, সেই পরিষেবা নিশ্চিত করার জন্য ন্যূনতম নাগরিক দায়বদ্ধতা প্রদর্শনে ঘোর আপত্তি।
বর্তমানে শহরবাসীর মধ্যে উন্নত সিটি করপোরেশন এবং ইউরোপ-আমেরিকার মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব নাগরিক আচরণের মধ্যে বিরাট ফারাক বিদ্যমান।
একদিকে যখন প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া, অন্যদিকে নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে অনেকের আচরণই যেন আফ্রিকান ইথিওপিয়ান স্তরের। অর্থাৎ, উন্নত নাগরিক সুবিধা পেতে হলে যে সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেই প্রাথমিক বোধটুকু থেকেই অনেকে সরে এসেছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পৌর প্রশাসনকে যেমন তাদের কাজ করতে হবে, তেমনি শহরের প্রতিটি নাগরিকের উচিত আগে সুনাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা এবং এই মূল্যবোধ শিশুদের মধ্যেও সঞ্চারিত করা। নচেৎ, প্রতি বছর বর্ষায় এই জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
উন্নত শহরের স্বপ্ন দেখলে, প্রথমে সুনাগরিকের ভূমিকা পালন করুন। আপনার বাড়ির আবর্জনা এবং নির্মাণশৈলী যেন অন্যের দুর্ভোগের কারণ না হয়।
সূত্র: উপজেলা প্রশাসন দোহার ঢাকা।

