শাহাদাত হোসেন: বর্তমানে ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান যুদ্ধ এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন বোমা হামলায় হাজার হাজার বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই হামলায় ঘর হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন গাজার প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। মানবিক এই বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে গাজাবাসী একদিকে যেমন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে তাদের হৃদয়ে রয়েছে ঈমানের দৃঢ়তা এবং পরকালে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
গাজায় আজ প্রতিটি ঘর, প্রতিটি পরিবার যুদ্ধের শিকার। আকাশ থেকে নেমে আসা বোমা হামলায় মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে মানুষের আশ্রয়স্থল। শিশুদের খেলার মাঠ, স্কুল, হাসপাতাল- কোনো কিছুই এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। যারা প্রাণে বেঁচে আছেন, তারা বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন স্কুল, হাসপাতাল অথবা জাতিসংঘের ত্রাণ শিবিরে। সেখানেও নেই পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা চিকিৎসার ব্যবস্থা। শীতের এই সময়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো হাজার হাজার পরিবারের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। এই পরিস্থিতিতে তাদের চোখেমুখে ক্লান্তি, কষ্ট এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছাপ স্পষ্ট।
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করেন অথবা জুলুমের শিকার হন, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, আর যারা আল্লাহ্র পথে হিজরত করে, তারা পৃথিবীতে আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরতকারী হিসেবে নিজ ঘর থেকে বের হয়, অতঃপর তার মৃত্যু হয়, তবে তার পুরস্কারের ভার আল্লাহর উপর ন্যাস্ত হয়। (সূরা নিসা, আয়াত ১০০)।
গাজাবাসীর এই বাস্তুচ্যুত জীবনকে মুসলিম উম্মাহর অনেকেই হিজরতের সাথে তুলনা করেন। তারা বিশ্বাস করেন, এই কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তার কারণে আল্লাহ তাদের মর্যাদাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। তারা আশা করেন, এই দুনিয়ার কষ্ট তাদের পরকালের জন্য পাথেয় হয়ে যাবে। যারা এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, তারা জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন বলে বিশ্বাস করা হয়। আর যারা জীবিত আছেন, তাদের কষ্টকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিয়ে পরকালে জান্নাতের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করবেন।
গাজাবাসীর চোখেমুখে কষ্ট থাকলেও তাদের ঈমানের আলো ম্লান হয়নি। তারা মনে করেন, এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী এবং আসল জীবন হলো পরকালের জীবন। তারা শহীদদের জন্য দোয়া করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, তাদের প্রিয়জনেরা আল্লাহর কাছে উত্তম স্থানে আছে। ঘরহারা এই মানুষগুলো দুনিয়ার সবটুকু হারালেও পরকালের জান্নাতের প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে আছেন। তাদের এই বিশ্বাসই তাদের অমানবিক কষ্ট সহ্য করার শক্তি জোগায়।
গাজার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাদের শারীরিক এবং মানসিক কষ্ট অপরিসীম। তবে তাদের ঈমানের দৃঢ়তা ও পরকালের প্রতি অগাধ বিশ্বাস এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা আজ ঘর হারিয়েছে, কিন্তু তাদের বিশ্বাস, পরকালে তারা জান্নাতের মেহমান হবে। এই চরম মানবিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে, তাদের এই ত্যাগ, কষ্ট এবং আল্লাহর প্রতি তাদের অগাধ বিশ্বাস বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক শিক্ষণীয় বার্তা।

