মাদক একটি মানুষের জীবনেই ধ্বংস ডেকে আনে না; বিপর্যস্ত করে একটি পরিবারকে, অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয় একটি প্রজন্মকে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন, পরিবারের শান্তি এবং সমাজের নিরাপত্তা- সবকিছুই মাদকের নিষ্ঠুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়। এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
আমরা অনেকেই অন্যায় দেখতে পাই, কিন্তু নিজের নিরাপত্তা, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা ঝামেলা এড়ানোর চিন্তায় মুখ ফিরিয়ে নিই। অথচ আজ যে বিপদকে অন্যের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছি, আগামীকাল তা আমাদের নিজের পরিবারের দরজায়ও এসে দাঁড়াতে পারে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা তাই প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের সামাজিক দায়িত্ব।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী তৎপরতা এবং পরবর্তী পদত্যাগের ঘটনা নানা আলোচনা তৈরি করেছে। তাঁর মাদকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার সদিচ্ছাকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। একজন জনপ্রতিনিধি নিজের এলাকার মানুষের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেবেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সক্রিয় হবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
একই সঙ্গে সেই উদ্যোগের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকতে হবে। অস্ত্র প্রদর্শন বা ভীতি সৃষ্টির অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায্য মূল্যায়ন প্রয়োজন। মাদকের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা- দুটিই একসঙ্গে ধরে রাখতে হবে। কোথাও ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ, যথাযথ পরামর্শ এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা উচিত। এমন পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়।
গণমাধ্যমের কাছেও সমাজের প্রত্যাশা অনেক। জনপ্রতিনিধির আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি মাদক ব্যবসার বিস্তার, এর পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও সমান গুরুত্বে অনুসন্ধান করা দরকার। কোথায় মাদক বিক্রি হচ্ছে, কারা লাভবান হচ্ছে, অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আনা জরুরি। সাংবাদিকতার শক্তি মানুষের বিপন্ন জীবনের পাশে দাঁড়াক, অপরাধের শিকড় উন্মোচন করুক।
সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও সুস্পষ্ট। মাদকবিরোধী অবস্থানকে কার্যকর করতে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধী ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপদে তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা, অভিযোগকারীর পরিচয় সুরক্ষা এবং অভিযোগের অগ্রগতি জানার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রতিটি এলাকায় শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি এবং তরুণদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ সচেতনতামূলক উদ্যোগ গড়ে উঠুক। তাঁরা পরিবারকে সহায়তা করবেন, তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন এবং তরুণদের খেলাধুলা ও গঠনমূলক কাজে যুক্ত করবেন। অভিযানের দায়িত্ব থাকবে অনুমোদিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পথও সহজ করতে হবে।
আমি চাই, ইশরাকের মাদকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার মতো সাহস আরও মানুষের মধ্যে জাগুক। সেই সাহস হোক সংযত, দায়িত্বশীল ও আইনসম্মত। প্রতিটি মহল্লা ও গ্রামে মানুষ সচেতন হলে, প্রশাসন জবাবদিহি করলে এবং গণমাধ্যম নির্ভয়ে সত্য তুলে ধরলে প্রতিরোধ শক্তিশালী হবে।
আমাদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য আজই কথা বলতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে এবং একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে এই সামাজিক অঙ্গীকার হোক আমাদের সবার।
–তানভির আহমেদ সানু
সমাজসেবক
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টিসিএল গ্রুপ

