মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এরই অংশ হিসেবে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদানের যুগান্তকারী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেছে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলা প্রশাসন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে কুলিয়ারচর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাফফাত আরা সাঈদ।
এ সময় তিনি বলেন, গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। পাইলটিং পর্যায়ে (জুন ২০২৬ পর্যন্ত) দেশের ৮টি বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ভিত্তিতে নির্বাচিত ৭১ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা প্রদান করা হয়েছে। পাইলটিং কার্যক্রম পরিচালনায় বরাদ্দকৃত ৮৬.৬০ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৬৫.৭৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৫৭.২০ কোটি টাকা ভাতা হিসেবে প্রদান করা হয়েছে।
জুলাই ২০২৬ থেকে কর্মসূচির মূল বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভাতা হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক হালনাগাদকৃত প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতিতে দেশের সব পরিবারকে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে পাঁচটি কোয়ান্টাইলে—অতিদরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত—বিভক্ত করা হয়েছে। পিএমটি স্কোর অনুযায়ী, ৮৬০ নম্বর বা তার কম নম্বরপ্রাপ্ত নারী পরিবারপ্রধান ভাতা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন। সব নারী পরিবারপ্রধান ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। তবে শুধু প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ান্টাইলভুক্ত (নিম্ন স্কোরপ্রাপ্ত) নারী পরিবারপ্রধান ভাতা পাবেন।
আজ ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ থেকে দেশব্যাপী একযোগে সব এলাকার খানা ও পরিবারের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড খানা তথ্যভান্ডারের তথ্য সংগ্রহ নির্দেশিকা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের জন্য ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োজিত করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীদের এ-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের প্রথম পর্যায় সম্পন্ন হয়েছে।
কর্মীরা মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিশেষায়িত ট্যাবলেট ডিভাইসের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং সংগৃহীত তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করবেন। এ কার্যক্রম কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মোবাইল সিম কার্ড সংগ্রহ, নেটওয়ার্কভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা, কর্মী ব্যবস্থাপনা, নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি) কক্ষ স্থাপনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
এ পদ্ধতিতে ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে দেশব্যাপী আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের (প্রতি পাঁচজন সদস্য মিলে একটি পরিবার) তথ্য সংগ্রহ ও ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পিএমটি পদ্ধতিতে ডেটাবেইস থেকে যোগ্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। চলতি অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরবর্তী তিন অর্থবছরে যোগ্য সব নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতার আওতায় আনা হবে।
উপকারভোগীদের দেওয়া ফ্যামিলি কার্ডে ডুয়াল চিপ, কিউআর কোড ও নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (এনএফসি) সুবিধা থাকবে, যা সরকারের টাকাপে পেমেন্ট স্কিমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এ কার্ডের মাধ্যমে উপকারভোগীরা ব্যাংকের এটিএম বুথ, বিপণিবিতানের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) থেকে ভাতা উত্তোলন করতে পারবেন।
এ সময় উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহবুবা সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুলিয়ারচর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. শাহাদাৎ হোসেন শাহ আলম, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ.এইচ.এম. ইজাজুল হকসহ স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা। এ ছাড়া উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারীরাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রেস কনফারেন্স শেষে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারীদের মধ্যে ট্যাবলেট ডিভাইস বিতরণ করা হয়।

