মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): সরকারি বদলি আদেশের তোয়াক্কা না করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে ক্ষমতার দাপটে কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে রয়েছেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার।
সরকারি খাসজমি ব্যক্তি নামে নামজারি (খারিজ), অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে জালিয়াতি, প্রকাশ্যে সরকারি সম্পদের মূল্যবান গাছ বিক্রি, ঘুষ দাবি ও গ্রহণের একাধিক অভিযোগে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি স্ট্যান্ড রিলিজ (তাৎক্ষণিক অবমুক্ত) আদেশের পরও অফিস ত্যাগ না করে তিনি অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর খুঁটির জোর কোথায়? কে বা কারা তাঁকে ‘সেল্টার’ দিচ্ছেন, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাছিমা আক্তার নিয়মিত অফিস করছেন।
জানা যায়, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীপুর বাজারের সরকারি খাসজমি (এসএ দাগ-৯১৯২, বিআরএস দাগ-২৭২৫৬) অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে যথাযথ তদন্ত ছাড়াই মো. এনামুল হক নামে এক ব্যক্তির নামে নামজারির প্রস্তাব প্রেরণ করেন নাছিমা আক্তার, যা পরবর্তীতে অনুমোদিত হয়।
এ ঘটনার খবর পেয়ে গত ১২ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। বাজারের পক্ষ থেকে দুজনের স্বাক্ষরিত আবেদনে ইজারাকৃত লক্ষ্মীপুর বাজারের সরকারি খাসজমির নামজারি বাতিলের জন্য ইউএনওর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। বিষয়টি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অবৈধভাবে সম্পন্ন হওয়া নামজারি অবিলম্বে বাতিল এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা নাছিমা আক্তারের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয় ওই আবেদনে।
এরপর তদন্ত সাপেক্ষে ওই খারিজ বাতিল করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইয়াসিন খন্দকার। তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও খাসজমি দখলের চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা এই ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু খাসজমিই নয়, সাধারণ গ্রহীতাদের জমিও জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারি (খারিজ) করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী মো. বকুল মিয়ার অভিযোগ, সম্প্রতি তাঁর ভাগের ৪ শতাংশ জমি নিজের নামে খারিজ করতে গেলে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।
তিনি ও তাঁর ভাই জালাল মিয়া ২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কুলিয়ারচর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ২৭৭৫ নম্বর দলিলমূলে গোবরিয়া আব্দুল্লাপুর মৌজার ৮ শতাংশ জমি যৌথভাবে ক্রয় করেন। দলিল অনুযায়ী, দুই ভাই সমহারে অর্থাৎ ৪ শতাংশ করে জমির মালিক হয়ে ভোগদখলে আছেন। কিন্তু অসাধু উপায়ে আর্থিক সুবিধা নিয়ে নাছিমা আক্তার পুরো ৮ শতাংশ জমিই জালাল মিয়ার ছেলেদের নামে খারিজ করে দেন বলে অভিযোগ করেন বকুল মিয়া। এতে নিজের ৪ শতাংশ জমির অধিকার হারিয়ে তিনি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ বিষয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী বকুল মিয়া বলেন, উক্ত কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে তাঁর বৈধ জমি বিবাদীদের নামে খারিজ করে দিয়েছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। তিনি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর প্রাপ্য ৪ শতাংশ জমির নামজারি ফেরত পেতে প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অপরদিকে, ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ কুলিয়ারচর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কর্তৃক ৮৮৯ নম্বর দলিলমূলে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর মৌজার ৫৭০৫ নম্বর খতিয়ানের ১৮০১ নম্বর দাগের শ্রেণি ‘কান্দা’ থেকে ৮ শতাংশ ভূমির মালিক ও দখলদার হন কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের পূর্ব গোবরিয়া গ্রামের মো. জালাল উদ্দিন ও মোছা. সুফিয়া খাতুন দম্পতির ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি ওই দলিলদাতা মো. হানিছ মিঞার কাছ থেকে একই দলিলে ৩৬৪৫, ৩৬৪৭ ও ১৩৭৮ নম্বর দাগ থেকে আরও ৮ শতাংশ জমির মালিক ও দখলদার হন।
২০২৫ সালের ১৪ জুলাই মো. সাইফুল ইসলাম ১৮০১ দাগে ক্রয়কৃত ৮ শতাংশ ভূমি খারিজের জন্য আবেদন করেন। তৎকালীন গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট নামজারির প্রস্তাব পাঠান এবং একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসানের স্বাক্ষরে নামজারি (খারিজ) সম্পন্ন হয়। যার খতিয়ান নম্বর ২৫-১৩৬৯০।
এ বিষয়টি অবগত হওয়ার পরও বর্তমান দায়িত্বে থাকা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে চার মাসের ব্যবধানে একই দলিলের একই দাগে (১৮০১) প্রাপ্ত ৮ শতাংশ ভূমি মো. সাইফুল ইসলামের নামে নামজারি (খারিজ) প্রস্তাব পাঠান। যা চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসানের স্বাক্ষরে অনুমোদিত হয়। যার খতিয়ান নম্বর ২০২৬-১০০০৬৭।
এ নিয়ে একই দাগে জমির মালিক মো. সাইফুল ইসলামের নামে দুইবার নামজারি (খারিজ) করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, মো. সাইফুল ইসলাম ১৮০১ দাগে শুধু ৮ শতাংশ জমির ক্রয়কৃত মালিক; তিনি ওই দাগে ১৬ শতাংশ জমির মালিক নন।
অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ইউনিয়ন ভূমি অফিসসংলগ্ন সরকারি হালট ও রাস্তার পাশ থেকে প্রায় ২০-২৫টি মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এসব গাছের আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ লাখ টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দেওয়া হলেও অনুসন্ধানে জানা যায়, সেটি এজাহার বা এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি।
পরবর্তীতে জুলাই মাসে পুনরায় দুই দফায় গাছ কাটা হয়। এর ভিডিও প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নাছিমা আক্তার প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে আবারও অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুলিয়ারচর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূমি অফিসে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ২৩ জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নাছিমা আক্তারকে তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়। রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর স্বাক্ষরিত আদেশে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং নির্দেশ অমান্য করলে তা ‘তাৎক্ষণিক অবমুক্ত’ (Stand Release) হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়।
কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে তিনি এখনও গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপরদিকে, গণমাধ্যমে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় এ প্রতিবেদককে (মুহাম্মদ কাইসার হামিদ) হত্যার জন্য নাছিমা আক্তার ও তাঁর সহযোগীরা সন্ত্রাসী ভাড়া করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সন্ত্রাসীরা এ প্রতিবেদককে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
জানা যায়, সরকারি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পত্রিকায় কিংবা গণমাধ্যমে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বা এককভাবে ওই সংবাদের প্রতিবাদ বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যায় না- এমন সরকারি বিধিবিধান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ ধরনের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর প্রাসঙ্গিক বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
এমন বিধিবিধান থাকা সত্ত্বেও ওই কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়াই যৌথ স্বাক্ষরে গত ২৪ জুলাই জাতীয় দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং গত ২৬ জুলাই সাপ্তাহিক সোনালী ধারা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যা সরকারি নিয়ম ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযুক্ত ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিন দফা গাছ কাটার বিষয়ে থানায় দুটি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সত্যতা স্বীকার করেন। তবে ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগে অপরাধীদের নাম কেন দেওয়া হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অভিযুক্ত অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিন বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। গাছ কাটার বিষয়ে কুলিয়ারচর থানায় দুটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগপত্রে কারও নাম না থাকায় বাদীকে সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করতে বলা হলেও তিনি রাজি হননি। তবে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, প্রশাসনিক এই রহস্যজনক নীরবতা ও বদলির আদেশ অমান্যের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল। তাঁরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলেন, ভূমি কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার যোগদানের পর থেকেই সাধারণ মানুষকে খাজনা ও খারিজের নামে হয়রানি করে আসছেন। সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি সরকারের স্বার্থ ও সরকারি সম্পত্তিকে চরম ক্ষতির মুখে ফেলছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইয়াসিন খন্দকার বলেন, অচিরেই বদলিকৃত গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তারকে রিলিজ দেওয়া হবে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

