মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় নির্মমভাবে নিহত অটোরিকশাচালকের ছেলে জুয়েল মিয়া (২০) হত্যার প্রতিবাদে এবং প্রকৃত খুনিদের ফাঁসির দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন হত্যাকাণ্ডের স্থান বড়চারা গ্রামের ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন অতিবাহিত হলেও জুয়েল হত্যার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা না হওয়ায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শনিবার (১৯ জুলাই) বাদ আসর উপজেলার আগরপুর-পোড়াদিয়া মহাসড়কের বড়চারা নতুন বাজার সড়কে ‘১নং গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে বড়চারা গ্রামের বাসিন্দা, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামছুল আলম এলেম, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব মো. ইমরান খান এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিনের ভাই শাহ আলমের নেতৃত্বে বড়চারা ও আশপাশের এলাকার সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
এ সময় বক্তারা বলেন, নিরপরাধ জুয়েলকে যারা হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে ফাঁসি দিতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তিকে যেন মামলায় আসামি করে হয়রানি করা না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারা।
এর আগে গত ১৩ জুলাই সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার আগরপুর-পোড়াদিয়া মহাসড়কের লক্ষ্মীপুর বাজারসংলগ্ন সেতুর ওপর ‘ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্মীপুরের জনগণ’ ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে লক্ষ্মীপুর ও আশপাশের এলাকার সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা সড়কের ওপর বাঁশ বেঁধে, শুয়ে পড়ে এবং টায়ার ও কাঠে আগুন জ্বালিয়ে বিকেল সোয়া ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
মানববন্ধনে উপস্থিত নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে একটি প্রভাবশালী মহল পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তারা বলেন, কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে মামলা রুজু ও তদন্তপ্রক্রিয়া ব্যাহত করা যাবে না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যদি সব খুনিকে আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে কুলিয়ারচরে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এর আগে গত ১১ জুলাই শনিবার জুয়েল মিয়ার জানাজা শেষে লাশ দাফনের আগে খাটিয়া কাঁধে নিয়ে শত শত মানুষ লক্ষ্মীপুর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠ থেকে বুধাইবাড়ি পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন। দফায় দফায় বিক্ষোভ সত্ত্বেও কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ জুলাই শুক্রবার বিকেলে জুয়েল মিয়া তার এক বন্ধুর ডিমবাহী গাড়িতে চড়ে আগরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে লক্ষ্মীপুর বাজারের দিকে আসছিলেন। গাড়িটি গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা বাজারের ১০০ গজ পশ্চিমে পৌঁছালে ওত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত সেটির গতি রোধ করে। তারা জুয়েলকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তায় এলোপাতাড়ি মারধর করে চলে যায়। এ সময় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসীর দাবি, লক্ষ্মীপুর ও বড়চারা এলাকার কয়েকজন যুবকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। তবে নিহত জুয়েল সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন এবং ওই বিরোধের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বুধাইবাড়ি গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. কুদ্দুস মিয়ার ছেলে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন বলেন, হত্যার কারণ উদ্ঘাটন এবং প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ মাঠে কাজ করছে।

